Logo Logo

ব্রহ্মপুত্রের ক্যানভাসে জয়নুল আবেদিন পার্ক: যেখানে কোলাহল ভুলে প্রকৃতি মেশে ঐতিহ্যে


Splash Image

নগর জীবনের ইট-পাথরের খাঁচা আর যান্ত্রিক কোলাহলে যখন হাঁপিয়ে ওঠে প্রাণ, তখন এক টুকরো প্রশান্তি আর প্রকৃতির স্নিগ্ধতার খোঁজে মানুষের মন ব্যাকুল হয়ে ওঠে। ময়মনসিংহ শহরের বুক চিরে বয়ে যাওয়া বুড়ো ব্রহ্মপুত্র নদের কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন পার্ক ঠিক তেমনই এক স্বস্তির ঠিকানা। যেখানে জল, হাওয়া আর ইতিহাস মিলেমিশে তৈরি করেছে এক জীবন্ত ক্যানভাস।


বিজ্ঞাপন


এই পার্কের পরতে পরতে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের আধুনিক শিল্পের জনক, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের স্মৃতি। এই ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে বসেই তিনি একদা তুলির আঁচড়ে এঁকেছিলেন তাঁর বিখ্যাত সব ছবি। পার্কের এক প্রান্তে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে 'শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালা', যা শুধু একটি জাদুঘর নয়, বরং এই অঞ্চলের শিল্প-সংস্কৃতির এক ঐতিহাসিক স্মারক। এখানে এলে দর্শনার্থীরা প্রকৃতির পাশাপাশি অবগাহন করতে পারেন শিল্পাচার্যের কালজয়ী সৃষ্টিতে।

বর্ষায় বুক ভরা নদী আর রূপালী জলধারার রঙে ঋতুভেদে এই পার্কের রূপ বদলায়। তবে বর্ষায় ব্রহ্মপুত্র যখন তার চেনা রূপ ফিরে পায়, তখন পার্কের সৌন্দর্য এক ভিন্ন মাত্রা ধারণ করে। চারপাশের খটখটে বালুচর ডুবিয়ে নদীর বুক ভরে ওঠে টইটম্বুর পানিতে। ঢেউয়ের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ আর থৈ থৈ রূপালী জলধারা পার্কের ওয়াকওয়ে ছুঁয়ে যায়। ঘাটে বাঁধা সারিবদ্ধ নৌকা আর মাঝিদের হাঁকডাক এক লহমায় ব্যস্ত শহুরে মানুষকে মনে করিয়ে দেয় আবহমান বাংলার চিরন্তন রূপ।

এ পার্কের পাশ দিয়ে বয়ে চলা ব্রহ্মপুত্র নদীর ওপার জুড়ে কাশবনের শুভ্র হাতছানি। শরতের আগমনে যখন মেঘমুক্ত নীল আকাশে তুলোর মতো মেঘ ভাসে, তখন নদীর ওপার এক মায়াবী রূপ ধারণ করে। পার্কের বেঞ্চে বসে নদীর ওপারে তাকালেই চোখে পড়ে দিগন্তজোড়া কাশবনের শুভ্রতা। মৃদু বাতাসে দুলতে থাকা কাশের রেণু যেন ওপার থেকে নগরবাসীকে স্বাগত জানায়। অনেকেই তখন ইঞ্জিনচালিত নৌকা কিংবা ডিঙি নৌকায় চড়ে নদী পার হয়ে চলে যান ওপাড়ে কাশবনের সেই সাদা চাদরে হারিয়ে যেতে।

শহরের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও জয়নুল আবেদিন পার্কে ঢুকলে এক অদ্ভুত শান্ত পরিবেশ গ্রাস করে। সারি সারি মেহগনি, রেইনট্রি আর কৃষ্ণচূড়া গাছের শীতল ছায়া, পাখিদের কিচিরমিচির আর নদী থেকে ধেয়ে আসা হিমেল হাওয়া মুহূর্তেই ক্লান্তি দূর করে দেয়। এখানে কোনো যান্ত্রিক হর্ন নেই, নেই ইট-পাথরের দেওয়ালের দেয়ালবন্দী জীবন। পড়ন্ত বিকেলে ঘাসের ওপর বসে কিংবা নদীর পাড় ঘেঁষে হাঁটার সময় মনে হয়, শহর থেকে বহুদূরের কোনো এক শান্ত গাঁয়ে এসে দাঁড়িয়েছেন কেউ।

প্রকৃতির স্নিগ্ধতার পাশাপাশি এই পার্কটি ময়মনসিংহবাসীর সামাজিক মেলবন্ধনের অন্যতম কেন্দ্রস্থল। প্রতিদিন ভোরে এখানে জড়ো হন স্বাস্থ্যসচেতন 'মর্নিং ওয়াকাররা', যাঁদের পদচারণায় মুখরিত হয় পার্কের চারপাশ। বিকেলে এটি রূপ নেয় পরিবার, বন্ধুবান্ধব আর যুগলদের মিলনস্থলে । পার্কের ভেতর থাকা ছোটদের রাইড, মিনি চিড়িয়াখানা এবং মুখরোচক চটপটি-ফুচকার দোকানগুলো বিনোদনের ষোলোকলা পূর্ণ করে।

ব্রহ্মপুত্র নদ, ওপারের কাশবন, বর্ষার জলরাশি আর জয়নুল আবেদিনের ঐতিহ্য, সব মিলিয়ে এই পার্কটি ময়মনসিংহের শুধু একটি দর্শনীয় স্থানই নয়, বরং এই শহরের ফুসফুস। শত বছরের প্রাচীন ব্রহ্মপুত্রের শান্ত জল আর পার্কের সবুজ ছায়া যেন যুগ যুগ ধরে পরম মমতায় আগলে রাখছে এই ঐতিহাসিক শহরের ক্লান্ত মানুষদের।

- মো. আরাফাত রহমান, কলামিস্ট ও সাংবাদিক, সাবেক শিক্ষার্থী, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়।

বিজ্ঞাপন বিজ্ঞাপন

আরো দেখুন


বিজ্ঞাপন

পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...