বিজ্ঞাপন
আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় বিচার সমাপ্ত করার জন্য বর্ণিত ১৮০ দিনের সময়সীমা বাধ্যতামূলক (Mandatory) নয়; বরং তা নির্দেশনামূলক (Directory)। ফলে আইনি সময়সীমা অতিক্রান্ত হওয়ার কারণে ট্রাইব্যুনালের বিচারিক প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে অকার্যকর বা বিরূপ কোনো পরিণতির মুখে পড়বে না।
‘মো. সাইফুল ইসলাম ওরফে পাভেল বনাম রাষ্ট্র’ মামলার বিপরীতে ইডেন কলেজের এক ছাত্রীকে ধর্ষণের ঘটনায় জারি করা রুল খারিজ করে বিচারপতি কে. এম. কামরুল কাদের এবং বিচারপতি মোহাম্মদ শওকত আলী চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ২০২৩ সালের ৭ জুন এই ঐতিহাসিক রায় প্রদান করেন। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে রায়টির পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করা হয়েছে।
মূল রায়ের রচয়িতা বিচারপতি মোহাম্মদ শওকত আলী চৌধুরী আদেশে উল্লেখ করেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ২০ এবং ৩১ক (যা পূর্বে ৩০ক) ধারা গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সময়মতো বিচার শেষ করতে না পারার কারণে কোনো অবস্থাতেই মামলা স্থগিতের বিধান রাখা হয়নি। এই আইনে নির্দিষ্ট সময়সীমা অতিক্রমের দরুন প্রক্রিয়া বাতিল বা বিরূপ কোনো ফলাফল সৃষ্টির উল্লেখ না থাকায় ১৮০ দিনের সময়সীমা কেবল প্রশাসনিক দিকনির্দেশনা হিসেবে গণ্য হবে।
মামলাটির বিবরণে জানা যায়, কলেজে যাতায়াতের সূত্রে ২০০৭ সালে ইডেন কলেজের অনার্স প্রথম বর্ষের এক ছাত্রীর সঙ্গে আসামি সাইফুল ইসলাম ওরফে পাভেলের পরিচয় হয়। ওই বছরের ৮ জুলাই বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ওই ছাত্রীকে একটি বাসায় নিয়ে প্রথমবার এবং পরবর্তীতে একাধিকবার ইচ্ছার বিরুদ্ধে ধর্ষণ করা হয়। একপর্যায়ে ভুক্তভোগী পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়লে তাকে জোরপূর্বক গর্ভপাত করানো হয়। ২০০৮ সালের ২৭ জানুয়ারি রাজধানীর শ্যামপুর থানায় ভুক্তভোগীর মা পাভেলসহ কয়েকজনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন।
পুলিশি তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র দাখিল করা হলে ২০০৮ সালের ২৩ জুলাই ঢাকার ১-নম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচার শুরুর জন্য অভিযোগ গঠন করেন। তবে আসামি পাভেল নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন।
পরবর্তীতে ২০১১ সালের ৮ মে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন পাভেল। আবেদনে তিনি দাবি করেন, ২০০৮ সালের ১৩ জুলাই মামলা ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরিত হলেও নির্ধারিত ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে বিচার প্রক্রিয়া শেষ করা হয়নি। তাছাড়া আইনের ৩১ক ধারা অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে বিচার সম্পন্ন না হওয়ার কারণ উল্লেখ করে সুপ্রিম কোর্ট ও সরকারের কাছে প্রতিবেদন পাঠানোর বাধ্যবাধকতা থাকলেও ট্রাইব্যুনাল, পাবলিক প্রসিকিউটর কিংবা সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা তা পালন করেননি। রিটের প্রেক্ষিতে তৎকালীন সময়ে হাইকোর্ট ট্রাইব্যুনালের বিচারিক কার্যক্রম তিন মাসের জন্য স্থগিত করেন এবং পরবর্তীতে স্থগিতাদেশের মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়।
চূড়ান্ত শুনানিতে মূল আবেদন ও নথি পর্যালোচনা করে হাইকোর্ট লক্ষ্য করেন, আসামি চতুরতার সঙ্গে ২০১০ সালের ৭ নভেম্বরের পরবর্তী আদেশগুলো গোপন রেখে অসৎ উদ্দেশ্যে উচ্চ আদালতের আশ্রয় নিয়েছিলেন।
আদালতে আসামিপক্ষে আইনজীবী এম.এইচ রশীদ শুনানি করেন এবং রাষ্ট্রপক্ষে দায়িত্ব পালন করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল শেখ সাইফুজ্জামান (জামান) ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মো. শফিকুজ্জামান (রানা)। শুনানির পর হাইকোর্ট রুল খারিজ করে দেন এবং বিচারিক কার্যক্রমের ওপর পূর্ববর্তী স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে নিম্নাদালতকে বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার নির্দেশ প্রদান করেন।
জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন
পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...