Logo Logo

হাঁসের ডানায় ভর করে ইতিহাস: রুমিন ফারহানার একলা লড়াইয়ের অভূতপূর্ব জয়


Splash Image

একটি সাধারণ প্রতীক ‘হাঁস’। আর এক অসাধারণ রাজনৈতিক বার্তা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া–২ (সরাইল–আশুগঞ্জ–বিজয়নগর একাংশ) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জয়ী হয়ে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করেছেন ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। দলীয় মনোনয়নের বাইরে দাঁড়িয়ে, একক প্রচারণায় মাঠ দাপিয়ে বেড়ানো এই নারী প্রার্থী দেখিয়ে দিলেন জনআস্থা থাকলে প্রতীকই হয়ে উঠতে পারে বিপ্লবের ভাষা।


বিজ্ঞাপন


গ্রামীণ জনজীবনে হাঁস হচ্ছে শ্রম, ধৈর্য ও অভিযোজনের প্রতীক। সেই প্রতীককেই নিজের রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন রুমিন ফারহানা। তিনি প্রচারণায় বলেছিলেন, হাঁস হচ্ছে ভাগ্য পরিবর্তনে প্রতীক, হাঁস যেমন জলে-স্থলে টিকে থাকে, আমিও মানুষের পাশে থাকবো সুখে-দুঃখে, প্রতিকূলতায় ও সম্ভাবনায়।

এই বার্তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে জনপদে জনপদে। তরুণ ভোটার থেকে শুরু করে প্রবীণ নাগরিক অনেকে ‘হাঁস’কে দেখেছেন পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে।

দলীয় সীমা পেরিয়ে জনমতের জোয়ার

দলীয় মনোনয়ন না পাওয়ার পরও নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াননি তিনি। বরং ঘোষণা দেন “জনগণই আমার শক্তি, জনগণই আমার দল।”

রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কটূক্তি, সাংগঠনিক বাধা, প্রশাসনিক অভিযোগ সবকিছুর মাঝেও তিনি মাঠে ছিলেন সক্রিয়। টেলিভিশন টকশোতে স্পষ্টভাষী অবস্থান ও আদালতের লড়াইয়ে পরিচিত মুখ হিসেবে তাঁর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা নির্বাচনে বড় ভূমিকা রাখে।

প্রচারণায় তিনি স্মরণ করেন তাঁর পিতা, ভাষা আন্দোলনের সৈনিক অলি আহাদ-কে। ১৯৭৩ সালে এই আসন থেকেই নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু পূর্ণাঙ্গভাবে কাজের সুযোগ পাননি এমন আক্ষেপ তুলে ধরে রুমিন ফারহানা বলেন,

“আমি সেই অসমাপ্ত দায়িত্ব পূরণ করতে চাই। মানুষের আস্থা নিয়ে কাজ করতে চাই।”

এই আবেগঘন বার্তা ভোটারদের মধ্যে ঐতিহাসিক সংযোগ ও সহমর্মিতা তৈরি করে।

নির্বাচনের আগে বিভিন্ন কেন্দ্রে অনিয়মের আশঙ্কা তুলে ধরেন তিনি। কর্মীদের আটক ও সিল মারার অভিযোগ নিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলার বিষয়ও সামনে আসে। ভোটারদের উদ্দেশে তাঁর স্পষ্ট আহ্বান ছিল “ফল ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত সজাগ থাকতে হবে। আপনার ভোট আপনার ভবিষ্যৎ।”

এই বক্তব্য নির্বাচনী মাঠে বাড়তি সাড়া ফেলে।

জয়ে আত্মবিশ্বাস, কৃতজ্ঞতার ভাষা

ফলাফল ঘোষণার পর দেখা যায় সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে জয় তাঁরই। বড় ব্যবধানে জয়ী হয়ে তিনি বলেন, “এই বিজয় ব্যক্তিগত নয়; এটি জনগণের বিজয়। যারা আমাকে আক্রমণ করেছেন, তাদের প্রতিও কৃতজ্ঞ কারণ মানুষ ব্যালটে জবাব দিয়েছে।”

তিনি দাবি করেন, কেবল প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী নয়, দলীয়ভাবেও তাঁকে ঠেকানোর চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু জনগণ প্রমাণ করেছে তাঁর পরিচয় কোনো নির্দিষ্ট দলের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়।

উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি, শান্তির অঙ্গীকার

স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়েও ব্রাহ্মণবাড়িয়া–২ আসনের বহু এলাকা উন্নয়নবঞ্চিত এমন মন্তব্য করে তিনি শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে অগ্রাধিকার দেওয়ার অঙ্গীকার করেন। সরাইলের দীর্ঘদিনের সংঘাত-রাজনীতি ভেঙে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি। “আমি প্রতিহিংসার রাজনীতি নয়, উন্নয়নের রাজনীতি করতে চাই” দৃঢ় উচ্চারণ তাঁর।

বিজয়ের পর শাহবাজপুরে তাঁর বাসভবনে সমর্থকদের ঢল নামে। ফুলেল শুভেচ্ছা আর স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।

এই ফলাফল প্রমাণ করেছে সংগঠন বড় শক্তি হলেও ব্যক্তি-সাহস, গ্রহণযোগ্যতা ও দৃঢ় অবস্থান কখনো কখনো প্রচলিত রাজনীতির সমীকরণ বদলে দিতে পারে।

একটি হাঁসের প্রতীক তাই হয়ে উঠেছে আশা, প্রতিবাদ ও আত্মবিশ্বাসের প্রতিচ্ছবি। আর ব্রাহ্মণবাড়িয়া–২-এ লেখা হয়েছে এক নতুন রাজনৈতিক ইতিহাস—যার কেন্দ্রে একলা পথচলার সাহসী নাম, রুমিন ফারহানা।

বিজ্ঞাপন বিজ্ঞাপন

আরো দেখুন


বিজ্ঞাপন

পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...