বিজ্ঞাপন
গল্পটা শুরু হয় একটা অদ্ভুত জন্মের কথা দিয়ে। ধান গমের ফসলের ভেতর দিয়ে সাপের মতো যে পথটা এগিয়ে গেছে, সেটাই আসলে আমাদের মূল চরিত্র। লেখক অসাধারণ একটা উপমা ব্যবহার করেছেন এখানে। সাপের গতির সাথে মেঠোপথের বাঁকানো রূপ মিলিয়ে দেওয়া একদম নিখুঁত। এই পথটা কীভাবে জন্ম নিল, কীভাবে মানুষের পদচিহ্ন তার গায়ে পড়ল, সব বলছে পথটা নিজের মুখে। মানুষের স্পর্শে এটা আধুনিক হয়, ইংরেজ আসার পর ইট পাথরের সড়ক হয়। কিন্তু এই রূপ বদলের আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না।
পাকিস্তান আমলে এই পথের যে কষ্ট, তা পড়লে বুক ভেঙে যায়। লেখক এখানে পথের শরীরে বড় বড় গর্ত তৈরির কথা বলেছেন। গাড়ি চলার সময় ওই গর্তের ওপর দিয়ে পড়লে পথটার যে ব্যথা, তা আসলে একটা নির্যাতিত জাতির ব্যথারই প্রতিচ্ছবি। গল্পে সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা ব্যবহার করেছেন চমৎকারভাবে। ‘আইয়ুব খান হালায় কি এই রাস্তাডা এট্টুও চোহে দ্যাহে না’, এমন সংলাপগুলো শুনলে মনে হয় আমিও সেই ভাঙা রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি, গাড়ির চাকায় কষ্টে কুঁকড়ে উঠছি। পথটার ভেতরের দ্বন্দ্বটা খুব স্পষ্ট। সে নিজেকে অক্ষম ভাবছে, তার চিৎকার কেউ শুনতে পারছে না। বোধসম্পন্ন মানুষেরা কখনোই রাস্তাটার দিকে খেয়াল করে তাকিয়েও দেখে না। এই অসহায়ত্বটা গল্পকে একটা গভীর মায়াবী শূন্যতা দিয়েছে।
একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট যখন আসে, তখন গল্পে একটা অন্যরকম আলো দেখা যায়। সাতই মার্চের ভাষণের পর মানুষের মুখে যে উল্লাস, সেটা বিলের জলে দুলতে থাকা শাপলা ফুলের পাপড়ির সাথে তুলনা করেছেন লেখক। পথটা ভাবে, হয়তো এবার তারও মুক্তি আসবে, হয়তো এই স্বাধীন দেশটাই তাদের স্বর্ণসন্তান হবে। কিন্তু শেষের দিকে একটা প্রবল সংশয় কাজ করে পথের মনে। সে মনে পড়ায় নির্বাসনের আগের স্বাধীনতার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি। এই দার্শনিক চিন্তাটা গল্পকে শুধু ঐতিহাসিক কথার গোছায় না রেখে একটা চিরন্তন মানবিক সত্যে পরিণত করেছে। প্রখ্যাত কবি আল মাহমুদের ‘সোনালি কাবিন’ কবিতায় যেমন স্বাধীনতার পরবর্তী হতাশার ছায়া দেখা যায়, এখানেও মুক্তির ঠিক আগের মুহূর্তে একটা অদ্ভুত আশঙ্কা কাজ করছে।
তবে একজন সৎ পাঠক হিসেবে বলতেই হয়, গল্পটায় কিছু বাহুল্য লক্ষ করা যায়। লেখক হয়তো পথের কষ্টটা বোঝাতে গিয়ে একই কথা বারবার বলে ফেলেছেন। বদলে যেতে থাকি, চলছেই আর চলছেই, খানা খন্দক, এরকম শব্দগুলোর বারবার ব্যবহার গল্পের স্বাভাবিক গতি কিছুটা ধীর করে দিয়েছে। পাকিস্তান আমলের কষ্টের কথা বলতে গিয়ে বাক্যগুলো একটু বেশি দীর্ঘ হয়ে গেছে। এছাড়া ইতিহাসের ধারাবাহিকতা বোঝাতে গিয়ে মাঝে মাঝে মনে হয়েছে লেখক একটা প্রবন্ধ লিখছেন, গল্প নয়। পথের আত্মা যখন কথা বলে, তখন তার ভাষা আরেকটু স্বচ্ছ আর সংক্ষিপ্ত হলে পাঠকের বুকে আরও বেশি আঘাত হানত। তারপরও এই ভাঙা পথের গল্পটা পড়ার পর মনটা অদ্ভুত এক বিষণ্ণতায় ভরে থাকে, যা সহজে কাটে না।
-মোস্তফা অভি।।
জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন
পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...