Logo Logo

খরচার হাওরে দুই বাস্তবতা: কোথাও স্বস্তির হাসি, কোথাও সর্বস্ব হারানোর আর্তনাদ


Splash Image

সুনামগঞ্জের বিস্তীর্ণ খরচার হাওর যেন চলতি বোরো মৌসুমে একসঙ্গে লিখেছে দুই বিপরীত গল্প। কোথাও আগাম ধান ঘরে তুলতে পেরে কৃষকের মুখে স্বস্তির হাসি, আবার কোথাও টানা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় পানির নিচে তলিয়ে গেছে কৃষকের বছরের একমাত্র সম্বল। একই হাওর, একই মৌসুম—তবু ক্ষতি আর সাফল্যের ব্যবধান যেন আকাশ-পাতাল।


বিজ্ঞাপন


সুনামগঞ্জ সদর ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা নিয়ে বিস্তৃত খরচার হাওরের মোট আবাদযোগ্য জমি প্রায় ৪ হাজার ৫১৫ হেক্টর। চলতি মৌসুমে এসব জমিতে ব্যাপকভাবে বোরো আবাদ করেন কৃষকরা। তবে এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে টানা বর্ষণ ও আকস্মিক জলাবদ্ধতায় বদলে যায় পুরো পরিস্থিতি। বিশেষ করে ২৬ এপ্রিলের পরের কয়েক দিনের অবিরাম বৃষ্টিতে শুধু ক্ষেতের ধানই নয়, কাটা ও মাড়াই করা ধানও রক্ষা করতে পারেননি অনেক কৃষক।

মঙ্গলবার খরচার হাওরের বিশ্বম্ভরপুর ও মুক্তিখলা এলাকা ঘুরে দেখা যায়, সামান্য রোদ উঠতেই সাবমারসিবল সড়ক ও খলার পাশে ধান শুকাতে ব্যস্ত কৃষক পরিবার। নারী-পুরুষ-শিশু সবাই শেষ সম্বলটুকু বাঁচাতে মরিয়া হয়ে কাজ করছেন। কোথাও স্বস্তি, কোথাও হতাশা আর দীর্ঘশ্বাস।

আগাম ধান চাষে স্বস্তি

খরচার হাওরের উত্তর-পূর্বাংশের কৃষকদের মধ্যে তুলনামূলক স্বস্তি দেখা গেছে। তারা আগাম জাতের বিআর-৯৬ ও বিআর-৮৬ ধান চাষ করেছিলেন। চৈত্রের শেষ সপ্তাহ ও বৈশাখের শুরুতেই অধিকাংশ ধান কেটে ফেলতে সক্ষম হওয়ায় বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হয়নি তাদের।

মুক্তিখলা গ্রামের কৃষক আব্দুল মান্নান জানান, ছয় কিয়ার জমিতে তিনি বিআর-৯৬ ধান চাষ করেছিলেন। সময়মতো ধান কাটতে পারায় তার উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়নি। প্রতি কিয়ারে ১৫ থেকে ২০ মণ পর্যন্ত ফলন পেয়েছেন বলেও জানান তিনি।

একই গ্রামের কৃষক আব্দুস জহুর বলেন, “আগে কাটতে পারছি বলেই বাঁচছি। পরে যারা কাটছে, তাদের ধান বৃষ্টিতে নষ্ট হয়ে গেছে।”

হাইব্রিড ধানে ভয়াবহ ক্ষতি

অন্যদিকে হাইব্রিড ধান চাষিদের অনেকেই ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। কৃষকদের অভিযোগ, ভেজা অবস্থায় বেশি সময় থাকলে হাইব্রিড ধানে দ্রুত অঙ্কুর গজিয়ে যায়। ফলে বৃষ্টির সময় কাটা ধান শুকাতে না পারায় বড় ধরনের লোকসান হয়েছে।

কৃষক আব্দুল মুকিত জানান, তিনি ‘ঝলক’ নামের হাইব্রিড ধান চাষ করেছিলেন। প্রথমদিকে ফলন ভালো হলেও শেষ পর্যায়ে বৃষ্টির কারণে কাটা ধানে অঙ্কুর গজিয়ে যায়। তার ভাষায়, “দেশি ধান ভিজা থাকলেও কিছুটা টিকে, কিন্তু হাইব্রিড ধান একদিন ভিজলেই মুখ ফেটে যায়।”

দক্ষিণাঞ্চলে সর্বনাশের চিত্র

খরচার হাওরের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। নোয়াগাঁও, হরিনগর, নল্লুয়া ও আশপাশের নিচু এলাকাগুলোতে জলাবদ্ধতার কারণে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কৃষকদের দাবি, তাদের অধিকাংশ জমির ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে।

নোয়াগাঁও গ্রামের কৃষক আব্দুর রহমান বলেন, “আমাদের সব শেষ। ধান তলাইয়া গেছে, যা কাটছিলাম তাও বৃষ্টিতে গ্যাড়া আইয়া নষ্ট অইছে। খড়ও রইল না। উপরের দিকের মানুষ বাঁচছে, আমরা মাইর খাইলাম।”

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও একই চিত্র তুলে ধরেছেন। গৌরারং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শওকত আলী বলেন, দক্ষিণাঞ্চলের জমিগুলো নিচু হওয়ায় ধান পাকতে দেরি হয়। ফলে শেষ সময়ের বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় কৃষকরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয়েছেন। তিনি দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনের দাবি জানান।

কৃষি বিভাগের তথ্য

সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক জানান, আগাম জাতের ধান হওয়ায় বিআর-৯৬ চাষিরা তুলনামূলক কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তবে বিআর-২৮ ও বিআর-২৯ জাতের ধান দেরিতে পাকায় বলে জলাবদ্ধতার সময় বেশি ক্ষতির মুখে পড়ে।

তিনি জানান, মঙ্গলবার পর্যন্ত জেলার হাওরাঞ্চলে প্রায় ৮০ শতাংশ ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে। হাওর ও নন-হাওর মিলিয়ে গড়ে ধান কাটা হয়েছে প্রায় ৬৯ শতাংশ। এবার জেলায় হাওরে ১ লাখ ৬৫ হাজার হেক্টর এবং নন-হাওরে ৫৮ হাজার ২৩৬ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছিল। সরকারি হিসাবে এখন পর্যন্ত প্রায় ২০ হাজার ১৬০ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ক্ষতির প্রকৃত হিসাব নিয়ে প্রশ্ন

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি হিসাবের সঙ্গে মাঠের বাস্তবতার বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। বিশেষ করে কাটা ও মাড়াইয়ের পর ধান নষ্ট হওয়া, অঙ্কুর গজানো এবং গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবে সংরক্ষিত খড় পচে যাওয়ার ক্ষতি অনেক ক্ষেত্রেই হিসাবের বাইরে থেকে যাচ্ছে।

হাওরের কৃষকরা বলছেন, এখন শুধু ক্ষতির পরিসংখ্যান নয়, প্রয়োজন দ্রুত পুনর্বাসন, সহজ শর্তে কৃষিঋণ, বীজ ও খাদ্য সহায়তা। কারণ হাওরের কৃষকের জন্য একটি ফসলি মৌসুম মানেই পুরো বছরের জীবন-জীবিকার ভরসা। আর সেই ফসল যখন পানির নিচে হারিয়ে যায়, তখন ডুবে যায় শুধু ধানক্ষেত নয়—একটি পরিবারের স্বপ্ন, ভবিষ্যৎ এবং বেঁচে থাকার আশাটুকুও।

বিজ্ঞাপন বিজ্ঞাপন

আরো দেখুন


বিজ্ঞাপন

পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...