বিজ্ঞাপন
চলতি মৌসুমে সরকার প্রতি মণ ধানের মূল্য ১ হাজার ৪৪০ টাকা নির্ধারণ করলেও হাওরের অসহায় কৃষকরা সেই সুবিধা থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত। মিল মালিক ও তাদের দালালচক্র ভেজা ও পচা ধানের অজুহাত দেখিয়ে সাধারণ কৃষকদের কাছ থেকে মাত্র ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা মণ দরে ধান কিনে নিচ্ছে। পরবর্তীতে সেই ধান শুকিয়ে চাল উৎপাদন করে সরকারি গুদামে আতপ চাল ৪৮ টাকা এবং সিদ্ধ চাল ৪৯ টাকা কেজি দরে সরবরাহ করা হচ্ছে। সরকারি গুদামে সরাসরি চাল সরবরাহের সুযোগ না থাকায় প্রকৃত উৎপাদনকারীরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, আর লাভ চলে যাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার কোরবাননগর ইউনিয়নের হাসন বাহার গ্রামের বাওন বিলপাড়ের কৃষক শামসুল মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, অতিবৃষ্টিতে ধান ভিজে গেছে এবং রোদ না থাকায় তা ঠিকমতো শুকানো যায়নি। অনেক ধানে চারা গজানোর সুযোগ নিয়ে সিন্ডিকেট ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা মণ দরে ধান কিনে নিচ্ছে। পরে সেই ধানই শুকিয়ে সরকারি গুদামে চাল হিসেবে বিক্রি করছে। ফলে লাভ হচ্ছে মিল মালিকদের, আর ঋণের বোঝা বাড়ছে কৃষকদের।
কৃষকদের অভিযোগ, সরকার হাওরাঞ্চলের কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় ধান ও চালের ভালো মূল্য নির্ধারণ করলেও মাঠ পর্যায়ের সিন্ডিকেটের কারণে বাস্তবে এর কোনো সুফল মিলছে না। বছরের পর বছর মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ফসল ফলানো কৃষকরা এখন চরম হতাশ ও ক্ষুব্ধ।
জানা যায়, চলতি মৌসুমে বৈশাখের শুরু থেকেই হাওরাঞ্চলে টানা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে ফসল কাটতে কৃষকদের চরম সংগ্রাম করতে হয়েছে। অনেক এলাকায় ধান পানির নিচে তলিয়ে যায়। পানির নিচ থেকে কষ্ট করে ধান তুলে আনার পরও রোদের অভাবে তা শুকানো সম্ভব হয়নি। এতে ধানের রঙ কালচে হয়ে গেছে এবং কোথাও কোথাও অংকুরোদগম ঘটেছে। পরবর্তীতে কিছু কৃষক রোদ পেয়ে নিজেদের খাওয়ার উপযোগী ধান তৈরি করতে পারলেও অধিকাংশ কৃষকই সরকারি গুদামে ধান বিক্রির সুযোগ পাননি। সরকারি সংগ্রহ নীতিমালায় সাধারণ কৃষকদের সরাসরি চাল সরবরাহের সুযোগ সীমিত থাকায় পুরো বাজার চলে গেছে মিল মালিকদের নিয়ন্ত্রণে।
ভুক্তভোগী কৃষকদের ভাষ্য, "পচা ধান", "ভেজা ধান", কিংবা "এই ধানে চাল হবে না"—এমন নানা অজুহাত দেখিয়ে ক্রেতারা ধানের দাম ইচ্ছেমতো কমিয়ে দিচ্ছেন। অথচ সেই একই ধান মিলাররা আধুনিক পদ্ধতিতে শুকিয়ে চাল তৈরি করে সরকার নির্ধারিত চড়া দামে গুদামে সরবরাহ করছেন।
কৃষক কুরআন আলী বলেন, এমনিতেই ফসলহানিতে আমরা দিশেহারা, তার ওপর ধানের দাম কমে যাওয়ায় আরও বিপদে পড়েছি। ভেজা ধান বলে সিন্ডিকেট কম দামে কিনে নিয়ে পরে সরকারের কাছে বেশি দামে বিক্রি করছে।
তবে সিন্ডিকেটের অভিযোগ অস্বীকার করে শহরের ফয়সাল অটো রাইস মিলের মালিক রাসেল আহমদ বলেন, মাঠ পর্যায় থেকে প্রায় ১ হাজার টাকা মণ দরে ভেজা ধান কিনতে হচ্ছে। এরপর সেগুলো শুকিয়ে মিলে ভাঙিয়ে সরকারি গুদামে আতপ চাল ৪৮ টাকা ও সিদ্ধ চাল ৪৯ টাকা কেজি দরে সরবরাহ করা হচ্ছে। এর পেছনে পরিবহন, শ্রমিক ও শুকানোর বড় একটি খরচ রয়েছে। এই ব্যবস্থার কারণে কৃষকরাও তাদের ভেজা ধান দ্রুত বিক্রি করতে পারছেন।
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে সুনামগঞ্জ জেলায় সরকারি গুদামে ১৭ হাজার ৭০৪ মেট্রিক টন সিদ্ধ চাল এবং ৯ হাজার ৩৪৭ মেট্রিক টন আতপ চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকার নির্ধারিত মূল্যে লাইসেন্সধারী মিল মালিকদের কাছ থেকেই এসব চাল সংগ্রহ করা হচ্ছে।
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা এবিএম মুশফিকুর রহমান বলেন, সরকার নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী চাল সংগ্রহ কার্যক্রম চলছে। লাইসেন্সধারী মিল মালিকদের কাছ থেকে আতপ চাল ৪৮ টাকা এবং সিদ্ধ চাল ৪৯ টাকা কেজি দরে কেনা হচ্ছে। আশা করা যাচ্ছে, দ্রুতই নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা সম্ভব হবে।
এদিকে হাওরাঞ্চলের কৃষকদের দাবি, সরকারি গুদামে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান ও চাল কেনার কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতেও এই সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বন্ধ হবে না। একই সঙ্গে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত ও ভেজা ধানের জন্য সরকারি পর্যায়ে আলাদা নীতিমালা ও বিশেষ সহায়তা প্রদানের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন
পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...