Logo Logo

কাতার বিশ্বকাপের সেই মরক্কো কি এবার ব্রাজিলকে চমকে দিতে পারবে?


Splash Image

২০২২ সালের ডিসেম্বরের এক জাদুকরি রাত। কাতারের মাঠে তখনো থ্রিলারের শেষ অঙ্ক জমা, কিন্তু মরক্কোর মারাকেশের প্রধান চত্বর ‘জেমা এল-ফনা’ ততক্ষণে ড্রাম, গান আর গগনবিদারী স্লোগানের কোরাসে উত্তাল। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর পর্তুগালকে বিদায় করে প্রথম আফ্রিকান দেশ হিসেবে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে উঠে ইতিহাস গড়েছিল মরক্কো। শুধু মারাকেশ নয়, সেদিন কাসাব্লাঙ্কা, রাবাত, ফেজ জেগে ছিল সারা রাত। চার বছর পর, ২০২৬ বিশ্বকাপে এসে হয়তো আরও একবার রাত জাগার প্রস্তুতি নিচ্ছে মরক্কো—কারণ প্রতিপক্ষ এবার পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল! আর সেলেসাওদের বিশ্বকাপে হারানোর সুযোগ তো প্রতিদিন আসে না।


বিজ্ঞাপন


চলমান বিশ্বকাপে ব্রাজিল–মরক্কো ম্যাচটি ফুটবলপ্রেমীদের আলাদা মনোযোগ দাবি করছে অনেক কারণেই। কাতার বিশ্বকাপে মরক্কোর শেষ চারে ওঠা যে কোনো সাময়িক ‘অঘটন’ ছিল না, গত চার বছরে বিশ্বমঞ্চে তা বুক ফুলিয়ে প্রমাণ করেছে তারা। সেবার পর্তুগালকে হারানোর আগে গ্রুপ পর্বে বেলজিয়াম আর দ্বিতীয় রাউন্ডে পরাশক্তি স্পেনকে বিদায় করেছিল তারা। কাকতালীয় বিষয় হলো, এই পর্তুগাল ও স্পেনের সঙ্গে জুটি বেঁধেই ২০৩০ বিশ্বকাপের যৌথ আয়োজক মরক্কো।

চলতি বছরেই আফ্রিকান কাপ অব নেশনস (আফকন)-এর এক অভূতপূর্ব ও বিতর্কিত ফাইনালের কারণে বিশ্বজুড়ে আলোচনায় আসে মরক্কো। রাবাতের প্রিন্স মুলায় আবদেহাল স্টেডিয়ামে ভিডিও রিভিউতে গোল বাতিলের প্রতিবাদে ফাইনালের প্রতিপক্ষ সেনেগাল মাঠ ছেড়ে চলে যায়। পরে তারা মাঠে ফিরে মরক্কোকে হারিয়ে শিরোপা জিতেছিল। কিন্তু সেই ম্যাচের মাস দুয়েক পর, আফ্রিকান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন মাঠ ছাড়ার শাস্তিস্বরূপ সেনেগালকে শিরোপাবঞ্চিত করে মরক্কোকে বিজয়ী ঘোষণা করে। ৫০ বছর পর আফকনের ট্রফি মরক্কোর ঘরে এলেও, এমন অদ্ভূত জয় হয়তো তারা নিজেরাও কখনো চায়নি।

বিশ্বকাপে অবশ্য টেবিলের সিদ্ধান্তে নয়, মাঠের লড়াইয়েই নিজেদের প্রমাণ করতে মরিয়া মরক্কো। দলের পোস্টার বয় আশরাফ হাকিমি পিএসজির হয়ে মাত্রই টানা দ্বিতীয় চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতে উড়ছেন। আক্রমণভাগে রিয়াল মাদ্রিদের তারকা ব্রাহিম দিয়াজ যোগ হওয়ায় শক্তি বেড়েছে বহুগুণ। আর গোলপোস্টের নিচে তো চীনের প্রাচীর হয়ে আছেন ইয়াসিন বনু।

তবে নতুন কোচ মোহাম্মদ উয়াহবির জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে চোট। রক্ষণের মূল স্তম্ভ নাইফ আগের্দ এবং ফরোয়ার্ড আবদে এজ্জালজুলি চোটে পড়ে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে গেছেন, যা টুর্নামেন্টের আগে মরক্কোর জন্য বড় এক ধাক্কা।

মরক্কান ফুটবলের এই এক্সপ্রেস গতিতে ছোটার পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ ও প্রাতিষ্ঠানিক দূরদর্শিতা। দলটির সবচেয়ে বড় ম্যাজিক ভিনদেশি প্রতিভাদের একই পতাকার নিচে আনা। আশরাফ হাকিমি, ব্রাহিম দিয়াজ কিংবা সোফিয়ান আমরাবাত—এদের কেউই মরক্কোয় জন্মাননি। ইউরোপের মাটিতে জন্ম নেওয়া ও বেড়ে ওঠা এই বিশ্বমানের ফুটবলারদের দেশের টান ও নিখুঁত প্রজেক্ট দেখিয়ে এক সুতোয় বেঁধেছে মরক্কো ফুটবল ফেডারেশন। যার প্রমাণ মিলেছে গত বছর ফিফা অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপে, যেখানে প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন হয় মরক্কো। সেই ঐতিহাসিক যুব দলের কোচ মোহাম্মদ উয়াহবিই এখন জাতীয় দলের ডাগআউটে, বিদায় নিয়েছেন কাতার বিশ্বকাপের নায়ক ওয়ালিদ রেগুরাই।

ভিনদেশি খেলোয়াড় খেলানোর নীতি অনেক দেশই নেয়, তবে মরক্কোর সাফল্য কেবল মাঠেই সীমাবদ্ধ নয়। আফ্রিকায় ফিফার সদর দপ্তর এখন মরক্কোতে। ২০৩০ বিশ্বকাপ একক আফ্রিকান দেশ হিসেবে যৌথভাবে আয়োজন করছে তারা। ফুটবলকে এখন রাজা মোহাম্মদের মরক্কো বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে নিজেদের প্রভাব বিস্তারের অন্যতম প্রধান ‘সফট পাওয়ার’ বা অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।

বিশ্বকাপ ও আফকনকে কেন্দ্র করে দেশটির অবকাঠামোতে ৫ থেকে ৬ বিলিয়ন ডলারের মহাপ্রজেক্ট চলছে। কাসাব্লাঙ্কার কাছে বেনস্লিমানে নির্মিত হচ্ছে ১ লাখ ১৫ হাজার আসনবিশিষ্ট অত্যাধুনিক স্টেডিয়াম, যেখানে ২০৩০ বিশ্বকাপের ফাইনাল হওয়ার জোর সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া রাবাত, ফেজ, তাঞ্জিয়ার ও মারাকেশের স্টেডিয়াম সংস্কারসহ রেল ও সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা বিশ্বমানের করা হচ্ছে।

তবে বিলিয়ন ডলারের স্টেডিয়াম বা ভূরাজনীতি—সবকিছুর বাইরে ফুটবল বিশ্ব এই মরক্কোকে ভালোবেসেছে কাতারের সেই চোখধাঁধানো, নির্ভীক ও আনন্দদায়ী ফুটবলের জন্য। আর ফুটবলের ব্যাকরণ অনুযায়ী ‘আনন্দদায়ী ফুটবল’ বললেই যে ব্রাজিলের নাম সবার আগে আসে, সেই সেলেসাওদের বিপক্ষে নিজেদের ফুটবল রূপকথার পুনরাবৃত্তি ঘটাতে মরক্কো যে নিজেদের উজাড় করে দেবে, তা বলাই বাহুল্য।

বিজ্ঞাপন বিজ্ঞাপন

আরো দেখুন


বিজ্ঞাপন

পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...