Logo Logo

যাদুকাটায় অবৈধ ড্রেজারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান

নদীতীর রক্ষায় বাঁশের বেড়া, শিমুল বাগান বাঁচাতে ইজারাদার-প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগ।


Splash Image

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধিঃ সুনামগঞ্জের সীমান্তবর্তী তাহিরপুর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী যাদুকাটা নদীতে অবৈধ ড্রেজার ও বোমা মেশিন দিয়ে নদীতীর কেটে বালু-পাথর উত্তোলনের বিরুদ্ধে এবার কঠোর অবস্থান নিয়েছে প্রশাসন ও বৈধ ইজারাদাররা।


বিজ্ঞাপন


নদীর পাড়, দেশখ্যাত শিমুল বাগান এবং নদীতীরবর্তী গ্রামগুলোকে রক্ষায় যাদুকাটা-১ ও যাদুকাটা-২ বালুমহালের নির্ধারিত সীমানাজুড়ে বাঁশের বেড়া (ব্যারিকেড) নির্মাণ, লাল সতর্কবার্তা টানানো এবং পাহারার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

জানা গেছে, চলতি অর্থবছরে জেলা প্রশাসন সরকারের পক্ষে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে যাদুকাটা-১ ও যাদুকাটা-২ বালুমহাল প্রায় ১০৭ কোটি টাকার রাজস্বের বিনিময়ে ইজারা প্রদান করে। ইজারার শর্ত অনুযায়ী নির্ধারিত সীমানার ভেতরে শুধুমাত্র বোমা মেশিন বা ড্রেজার ছাড়া সনাতন (ম্যানুয়াল) পদ্ধতিতে স্থানীয় শ্রমিকদের মাধ্যমে বালু ও পাথর উত্তোলনের অনুমতি রয়েছে। এর মূল লক্ষ্য পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, শিমুল বাগান সংরক্ষণ এবং নদীতীর ধস প্রতিরোধ।

কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী চক্র রাতের আঁধারে নিষিদ্ধ ড্রেজার ও বোমা মেশিন ব্যবহার করে যাদুকাটা নদীর তীর কেটে অবৈধভাবে কোটি কোটি টাকার বালু ও পাথর উত্তোলন করে আসছে। এতে নদীতীরবর্তী গ্রাম, কৃষিজমি এবং পর্যটন আকর্ষণ শিমুল বাগান মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। স্থানীয়দের দাবি, এই চক্রের বিরুদ্ধে অতীতে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় তারা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, অবৈধ বালু উত্তোলনের দায় বারবার বৈধ ইজারাদার ও সনাতন পদ্ধতিতে কর্মরত শ্রমিকদের ওপর চাপানোর চেষ্টা করা হয়েছে। অথচ প্রকৃতপক্ষে রাতের আঁধারে ড্রেজার ব্যবহার করেই নদীর তলদেশ ও পাড় কেটে পরিবেশ ধ্বংস করা হচ্ছে।

সনাতন পদ্ধতিতে বালু উত্তোলনকারী শ্রমিক মো. রমজান আলী, বাসু মিয়া ও মো. একলাস নূর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা ইজারার নির্ধারিত সীমানার মধ্যে হাতের শ্রমে বালু তুলে জীবিকা নির্বাহ করি। কিন্তু অবৈধ ড্রেজারচালিত সিন্ডিকেট রাতের অন্ধকারে নদীর পাড় কেটে কোটি কোটি টাকার বালু লুট করছে। বদনাম হচ্ছে আমাদের এবং বৈধ ইজারাদারদের। এভাবে চলতে থাকলে আমরা কাজ হারিয়ে অন্যত্র দিনমজুরি করতে বাধ্য হব।”

পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবার ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে ইজারাদার কর্তৃপক্ষ। সরেজমিনে দেখা গেছে, যাদুকাটা-১ ও ২ নম্বর মহালের সীমানার বাইরে নদীতীরজুড়ে বাঁশের শক্তিশালী ব্যারিকেড নির্মাণ করা হচ্ছে, যাতে কোনো ড্রেজার বা নৌযান নদীর পাড়ের কাছে যেতে না পারে। পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে লাল সতর্কবার্তা সম্বলিত ব্যানার ও ফেস্টুন টানানো হয়েছে।

ইজারাদার প্রতিনিধি মো. লোকমান মিয়া ও সাজ্জাদ মিয়া বলেন, “সরকারি নিয়ম মেনে ইজারা নিয়ে হাজারো শ্রমিকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। কিন্তু কিছু দুষ্কৃতিকারী রাতের আঁধারে শিমুল বাগানসংলগ্ন নদীতীর কেটে পরিবেশ ধ্বংস করছে। আমরা কোনো অবস্থাতেই অবৈধভাবে নদীর পাড় কাটতে দেব না।”

যাদুকাটা-১ ও ২-এর ইজারাদার শাহ রুবেল বলেন, “আমরা সরকারের কাছে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব দিয়ে বৈধভাবে মহাল ইজারা নিয়েছি। অথচ একটি চিহ্নিত প্রভাবশালী সিন্ডিকেট আমাদের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে এবং শিমুল বাগান ধ্বংস করতে অপতৎপরতা চালাচ্ছে। ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসকের কাছে ৮ থেকে ১০টি লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। আমরা নিজেদের অর্থায়নে নদীতীরে বাঁশের বেড়া নির্মাণ ও পাহারার ব্যবস্থা করেছি। আইন অমান্যকারী যেই হোক, তাকে আইনের হাতে তুলে দেওয়া হবে।”

সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার এ বি এম জাকির হোসেন (পিপিএম) বলেন, “অবৈধ বালু উত্তোলন ও নদীতীর কাটার বিরুদ্ধে পুলিশ নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৬৬টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এতে ৩৭৫ জন এজাহারভুক্তসহ মোট ৭২০ জনকে আসামি করা হয়েছে এবং ৬০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে ‘বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ (সংশোধনী-২০২৩)’ অনুযায়ী অপরাধটি জামিনযোগ্য হওয়ায় অনেক আসামি দ্রুত জামিনে বেরিয়ে আবার একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।”

তিনি আরও বলেন, “টাস্কফোর্স ও মোবাইল কোর্ট আরও কার্যকরভাবে পরিচালিত হলে ঘটনাস্থলেই অবৈধ নৌযান ও ড্রেজার ধ্বংস করা সম্ভব হবে। এতে অপরাধীরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বে এবং অবৈধ বালু উত্তোলন অনেকাংশে কমে আসবে। ইজারাদারদের বাঁশের বেড়া নির্মাণের উদ্যোগ প্রশংসনীয়।”

সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) তাপস শীল বলেন, “যাদুকাটা নদী শুধু একটি বালুমহাল নয়, এটি পরিবেশগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সম্পদ। শিমুল বাগান রক্ষা এবং নদীতীর ধস প্রতিরোধে জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ ও বিজিবি যৌথভাবে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। পরিবেশ ধ্বংসকারী যেকোনো কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রশাসন ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে অটল।”

তিনি আরও বলেন, “আইন প্রয়োগের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকেও এগিয়ে আসতে হবে। ইজারাদারদের বাঁশের ব্যারিকেড নির্মাণ এবং সীমানা সুরক্ষার উদ্যোগকে প্রশাসন স্বাগত জানায়।”

স্থানীয় সচেতন মহলের অভিমত, প্রশাসনের কঠোর অবস্থান, ইজারাদারদের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা এবং জনগণের সহযোগিতা যদি সমন্বিতভাবে অব্যাহত থাকে, তবে যাদুকাটা নদীর অবৈধ পাড় কাটা বন্ধ হবে, রক্ষা পাবে দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র শিমুল বাগান এবং নিরাপদ থাকবে নদীতীরবর্তী জনপদ।

বিজ্ঞাপন বিজ্ঞাপন

আরো দেখুন


বিজ্ঞাপন

পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...