Logo Logo

বিদ্যুৎ বিতরণের দায়িত্ব বেসরকারি খাতে গেলে সমাধান নাকি নতুন দুর্ভোগ?


Splash Image

দেশে কাগজে-কলমে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেলেও কমেনি লোডশেডিং। বিপরীতে উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ ক্রয় করে কম দামে বিক্রির কারণে প্রতিবছরই বাড়ছে সরকারের ভর্তুকির বোঝা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রায় ৬৭ হাজার কোটি টাকার বকেয়া বিল। সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ খাত বর্তমানে বহুমাত্রিক সংকটের মুখোমুখি।


বিজ্ঞাপন


২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকার সর্বাধিক গুরুত্ব পাওয়া ১৫টি খাতের মধ্যে বিদ্যুৎ খাতকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৪ হাজার ৯৯৬ কোটি টাকা। তবে সরকারের হিসাব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরেই বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হতে পারে।

এই আর্থিক চাপ মোকাবিলায় বিদ্যুৎ খাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ—বিতরণ ব্যবস্থাপনা—বেসরকারি খাতের হাতে দেওয়ার বিষয়ে ভাবছে সরকার।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পাইকারি সরবরাহ সরকারের নিয়ন্ত্রণেই থাকবে। তবে খুচরা পর্যায়ে গ্রাহকের কাছে বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং বিতরণ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তরের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সম্মতিও পাওয়া গেছে বলে জানান তিনি।

মন্ত্রী বলেন, সরকার ভর্তুকি হিসেবে যে অর্থ দিচ্ছে সেটিও জনগণের করের টাকা। আবার বিদ্যুতের দাম বাড়লেও সেই অর্থও গ্রাহকদেরই পরিশোধ করতে হয়। অর্থাৎ দুই দিক থেকেই সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ খুঁজতেই সরকার বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে।

সরকারের এই উদ্যোগ সামনে আসার পর বিদ্যুৎ খাতে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। শুধু দায়িত্ব পরিবর্তন করলেই কি দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা দূর হবে, নাকি এর ফলে গ্রাহকের বিদ্যুৎ বিল ও ভোগান্তি আরও বাড়বে—এমন প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।

জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞদের বড় একটি অংশ মনে করেন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে বিতরণ ব্যবস্থাপনা তুলে দিলেই বিদ্যুৎ খাতের সংকটের সমাধান হবে না। বরং মুনাফাকেন্দ্রিক পরিচালনার কারণে বিদ্যুতের দাম আরও বাড়তে পারে।

তাদের মতে, গত দেড় দশকে সরকারের নীতিগত দুর্বলতা, অপরিকল্পিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন এবং ভুল পরিকল্পনার কারণেই উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও লোডশেডিং কমেনি। তাই বেসরকারিকরণের পরিবর্তে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে শক্তিশালী করা এবং কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করাই বেশি জরুরি।

বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত দীর্ঘদিন ধরেই অপরিকল্পিত মেগা প্রকল্প, আমদানিনির্ভরতা এবং কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে চাপে রয়েছে।

বিশেষ করে প্রয়োজন না থাকলেও বিদ্যুৎকেন্দ্র অলস রেখে হাজার হাজার কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধের সংস্কৃতি জাতীয় অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করেন তারা।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, দেশের জ্বালানি খাতে বর্তমানে এক ধরনের ভয়াবহ জরুরি অবস্থা বিরাজ করছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকারের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত প্রয়োজন।

তার মতে, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা শক্তিশালী না করে বেসরকারিকরণ করলে সাধারণ গ্রাহকের ব্যয় আরও বাড়বে। উদাহরণ হিসেবে তিনি এলপিজি বাজারের কথা উল্লেখ করে বলেন, সম্পূর্ণ বেসরকারি নিয়ন্ত্রণে থাকা এলপিজির দাম কখনোই কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। বরং বেসরকারিকরণের চাপে নিয়ন্ত্রক সংস্কৃতিই দুর্বল হয়ে পড়েছে।

তিনি আরও বলেন, জ্বালানির মতো রাষ্ট্রীয় কৌশলগত খাত বেসরকারি নিয়ন্ত্রণে গেলে দেশের সার্বভৌম স্বার্থও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)-এর কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা।

অধ্যাপক শামসুল আলমের মতে, বিইআরসির ক্ষমতা সীমিত করে নির্বাহী আদেশে জ্বালানির দাম বাড়ানো হচ্ছে, ফলে দেশের রেগুলেটরি ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, পুরো খাত পুনর্গঠন না করে শুধু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে দায়িত্ব তুলে দিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে এবং সরকারও রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়বে।

তিনি আরও বলেন, বিদ্যুৎ খাতে প্রতিনিয়ত অনিয়ম ও চুরির অভিযোগ উঠলেও কার্যকর শাস্তির নজির খুবই কম। যেসব দেশের উদাহরণ সরকার দিচ্ছে, সেখানে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো অনেক বেশি স্বাধীন ও শক্তিশালী।

তবে সব বিশেষজ্ঞ একই মত পোষণ করছেন না। তাদের একটি অংশ মনে করেন, শক্তিশালী ও স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা থাকলে বেসরকারিকরণের কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে।

তাদের মতে, এতে সরকারি দীর্ঘসূত্রিতা কমবে, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ হ্রাস পাবে, সিস্টেম লস কমানো সম্ভব হবে এবং বকেয়া বিল আদায়ও বাড়বে। যুক্তরাজ্য, ভারত ও তুরস্কে এই ধরনের মডেল সফল হয়েছে বলেও তারা উল্লেখ করেন।

তবে শর্ত একটাই—একটি স্বাধীন, শক্তিশালী এবং কার্যকর রেগুলেটরি কাঠামো নিশ্চিত করতে হবে।

বুয়েটের অধ্যাপক আব্দুল হাসিব চৌধুরীও মনে করেন, বেসরকারি খাতে গেলেই বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে—এমন ধারণা সঠিক নয়।

তিনি বলেন, ডেসকো ও পিজিসিবির শেয়ার সরকারের পাশাপাশি পুঁজিবাজারেও রয়েছে। এতে বাস্তবে কী ধরনের উন্নতি হয়েছে, সেটি আগে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

ব্যাংক খাতে অনিয়মের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ব্যাংকে লুটপাটের পর যেমন আমানতকারীর অর্থ সরকারকে ফেরত দিতে হয়েছে, বিদ্যুৎ খাতেও একই ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুৎ বিতরণ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে গেলে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ সামনে আসতে পারে।

বেসরকারি কোম্পানির মূল লক্ষ্য মুনাফা হওয়ায় তারা যদি কোনো অঞ্চলে একচেটিয়া দায়িত্ব পায়, তাহলে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর চাপ সৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে পাহাড়ি, দুর্গম কিংবা কম জনবসতিপূর্ণ এলাকায় কম মুনাফার কারণে সেবায় বৈষম্য দেখা দেওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

এ ছাড়া বর্তমানে সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকা ছয়টি বিতরণ সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। শ্রমিক অসন্তোষের আশঙ্কার কথাও উল্লেখ করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তাদের আশঙ্কা, কুইক রেন্টালের মতো অস্বচ্ছ চুক্তির মাধ্যমে যদি বিতরণ ব্যবস্থাও বেসরকারিকরণ করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে পুরো বিদ্যুৎ খাত নতুনভাবে জিম্মি হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

বর্তমানে দেশের সব বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কিনে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) বিইআরসি নির্ধারিত দামে ছয়টি বিতরণ সংস্থার কাছে বিক্রি করে।

সমস্যা হলো, পিডিবি যে দামে বিদ্যুৎ ক্রয় করে, তার চেয়ে কম দামে বিতরণ সংস্থাগুলোর কাছে বিক্রি করে। ফলে সৃষ্ট লোকসান সরকারকে ভর্তুকির মাধ্যমে বহন করতে হয়।

বিদ্যুৎমন্ত্রী জানিয়েছেন, বর্তমান সরকার বিদ্যুৎ খাতে ৬৭ হাজার কোটি টাকার বকেয়া বিলের দায় নিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। শুধু বিদ্যুৎ নয়, ভবিষ্যতে জ্বালানি তেলের আমদানি ও বিতরণ ব্যবস্থাপনাও বেসরকারি খাতে দেওয়া যায় কি না, সেটিও সরকার বিবেচনা করছে।

মন্ত্রী বলেন, মুম্বাইয়ে রিলায়েন্স, দিল্লিতে আদানি এবং কলকাতায় গোয়েঙ্কা গ্রুপ সফলভাবে বিদ্যুৎ বিতরণ পরিচালনা করছে। বাংলাদেশের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও সেই সক্ষমতা অর্জন করতে পারে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।

বিদ্যুতের দাম বাড়ার সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকার বর্তমানে প্রায় ১৭ টাকায় বিদ্যুৎ কিনে ৮ টাকায় বিক্রি করছে। দীর্ঘমেয়াদে এভাবে ভর্তুকি দিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।

তার মতে, বেসরকারি খাত বিদ্যুৎ সরবরাহ, চুরি নিয়ন্ত্রণ এবং বিল আদায়ে আরও দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে পারবে।

তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বেসরকারিকরণের সিদ্ধান্ত এখনই বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। সরকার বিষয়টি নিয়ে গবেষণা ও সম্ভাব্যতা যাচাই করছে। একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে আরও শক্তিশালী করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত, বিদ্যুৎ খাতে টেকসই সংস্কার চাইলে শুধু দায়িত্ব হস্তান্তর নয়, বরং নীতিগত দুর্বলতা দূর করা, পুরোনো চুক্তিগুলোর পুনর্মূল্যায়ন, কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

বিজ্ঞাপন বিজ্ঞাপন

আরো দেখুন


বিজ্ঞাপন

পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...