Logo Logo

মৎস্য, পাথর ও ধান : সংকটে সুনামগঞ্জের হাজার বছরের ‘হাওরসভ্যতা’


Splash Image

বাংলার লোকজ প্রবাদে বলা হয়— “মৎস্য, পাথর, ধান—সুনামগঞ্জের প্রাণ।” একটি বাক্যেই যেন ধরা পড়ে উত্তর-পূর্ব বাংলার সীমান্তঘেঁষা এই জেলার হাজার বছরের ইতিহাস, প্রকৃতি ও মানুষের জীবনসংগ্রাম। সুনামগঞ্জ কেবল একটি প্রশাসনিক জেলা নয়; এটি এক বিস্তীর্ণ হাওরসভ্যতা, যেখানে জল, মাটি ও মানুষের জীবন একই সুতায় গাঁথা।


বিজ্ঞাপন


সুনামগঞ্জ মানেই হাওর। বর্ষা নামলেই জেলার বিস্তীর্ণ জনপদ রূপ নেয় অথৈ জলরাশিতে। টাঙ্গুয়ার হাওর, শনির হাওর, হালির হাওর, দারাম, দেখার, ছনুয়ার, পাকনার, নলচুন্ডি—নামের পর নাম, অথচ প্রতিটি হাওরের রয়েছে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ও জীবনচিত্র। এই সময় নৌকাই প্রধান যান, জলই পথ। ভোরের কুয়াশা ভেদ করে জেলেদের নৌকা ছুটে চলে মাছ ধরার তাগিদে—যে দৃশ্য কেবল নৈসর্গিক সৌন্দর্য নয়, বরং জীবনধারণের বাস্তব প্রতিচ্ছবি।

সুনামগঞ্জের প্রাণশক্তি তার মৎস্যসম্পদ। অসংখ্য নদী, নালা, খাল ও বিল যুগ যুগ ধরে এখানকার মানুষের খাদ্য ও জীবিকার প্রধান উৎস। দেশি মাছ শুধু পুষ্টির জোগানই দেয় না, এটি এক স্বতন্ত্র সংস্কৃতি—মাছ ধরার নিজস্ব কৌশল, মৌসুমি উৎসব, হাট-বাজার সবই মৎস্যনির্ভর।

তবে বাস্তবতা ক্রমেই উদ্বেগজনক। অবৈধ জাল ব্যবহার, প্রজনন মৌসুমে নির্বিচার মাছ ধরা, নদী ও বিল ভরাটের ফলে প্রাকৃতিক জলাভূমি সংকুচিত হচ্ছে। কমে যাচ্ছে দেশি মাছের প্রজাতি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই কার্যকর সংরক্ষণ পরিকল্পনা ও কঠোর আইন প্রয়োগ না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই ঐশ্বর্য কেবল বইয়ের পাতাতেই খুঁজে পাবে।

পাথর সুনামগঞ্জের আরেক পরিচয়, আরেক ইতিহাস। তাহিরপুর, ছাতক ও সীমান্তবর্তী এলাকায় একসময় পাথর উত্তোলন ছিল হাজারো শ্রমজীবী মানুষের জীবিকার প্রধান উৎস। পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে নেমে আসা পাথর নদীর বুক থেকে সংগ্রহ করতে গিয়ে শ্রমিকেরা জীবনের ঝুঁকি নিতেন প্রতিদিন।

কিন্তু লাগামহীন পাথর উত্তোলন নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। ফলে পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে বর্তমানে পাথর উত্তোলন সীমিত করা হয়েছে। এতে একদিকে প্রকৃতি কিছুটা স্বস্তি পেলেও, অন্যদিকে বিকল্প কর্মসংস্থানের অভাবে শ্রমজীবী মানুষের জীবিকা সংকটে পড়েছে—যা নীতিনির্ধারকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

হাওড়াঞ্চলের বোরো ধান সুনামগঞ্জের অর্থনীতির অন্যতম স্তম্ভ এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শীত শেষে কৃষকের ঘামে হাওড়ের বিস্তীর্ণ জমিতে সবুজের ঢেউ ওঠে, আর বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠে তা রূপ নেয় সোনালি ধানে।

তবে এই কৃষিকাজ সবসময়ই ঝুঁকিপূর্ণ। আগাম পাহাড়ি ঢল, অকাল বন্যা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কৃষকের জীবনকে করেছে অনিশ্চিত। তবু তারা হাল ছাড়ে না, কারণ ধান এখানে শুধু ফসল নয়—এটি বেঁচে থাকার প্রতীক।

সুনামগঞ্জের প্রকৃতি কেবল সম্পদের আধার নয়, এটি সৌন্দর্যের অফুরন্ত ভাণ্ডার। টাঙ্গুয়ার হাওড়ের নীল জল, পাহাড়ঘেরা দিগন্ত, অতিথি পাখির কলরব—সব মিলিয়ে এই অঞ্চল পর্যটনের অপার সম্ভাবনা বহন করে। কিন্তু পরিকল্পনাহীন পর্যটন, প্লাস্টিক দূষণ ও পরিবেশগত উদাসীনতা এই সৌন্দর্যকেও হুমকির মুখে ফেলছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সুনামগঞ্জকে এখন আর কেবল ভোগের দৃষ্টিতে দেখার সময় নেই। হাওর, বিল, নদী-নালা, মাছ, কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের জীবন—সবকিছু মিলিয়েই সুনামগঞ্জ। টেকসই উন্নয়ন, পরিবেশবান্ধব নীতি ও স্থানীয় মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নিরাপদ নয়।

“মৎস্য, পাথর, ধান—সুনামগঞ্জের প্রাণ”—এই প্রবাদ শুধু পরিচয় নয়, দায়িত্বের কথাও মনে করিয়ে দেয়। প্রকৃতি বাঁচলে সুনামগঞ্জ বাঁচবে, আর সুনামগঞ্জ বাঁচলেই বাঁচবে দেশের এক অনন্য জীবনভিত্তিক হাওরসভ্যতা।

বিজ্ঞাপন বিজ্ঞাপন

আরো দেখুন


বিজ্ঞাপন

পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...