Logo Logo

অন্ধত্বের চশমা ও উগ্রবাদ:

সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে লুকিয়ে থাকা চরমপন্থা


Splash Image

"উগ্রবাদ" বা "চরমপন্থা" শব্দ দুটি বর্তমান বিশ্বে অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং বহুলচর্চিত। গণমাধ্যম, বুদ্ধিজীবী মহল কিংবা রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে শব্দ দুটি উচ্চারণ করলেই সাধারণত একটি নির্দিষ্ট বলয় বা গণ্ডির কথা আমাদের মনে ভেসে ওঠে। কিন্তু এই সরলীকৃত ধারণা কি সমাজের আসল রোগটিকে ধরতে পারছে? উগ্রবাদ নিয়ে যেকোনো অর্থবহ আলোচনার আগে এর একটি সর্বজনীন, বস্তুনিষ্ঠ ও সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা প্রণয়ন করা জরুরি।


বিজ্ঞাপন


উগ্রবাদকে শুধু একটি নির্দিষ্ট ধর্ম বা গোষ্ঠীর ওপর এককভাবে চাপিয়ে দেওয়া এক ধরনের গভীর অন্ধত্ব, যা নিজেই একপ্রকার উগ্রবাদ। সমাজে উগ্রবাদের শিকড় আজ কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডিতে আবদ্ধ নেই; বরং তা আমাদের মনস্তত্ত্ব, সংস্কৃতি, আইন, রাজনীতি এবং অর্থনীতির প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে শেকড় গেড়ে বসেছে।

​উগ্রবাদ নিয়ে সচরাচর যে ধারণা বা দৃষ্টিভঙ্গি সমাজ আমাদের দিয়ে এসেছে, এর বাইরেও আরো অনেক ধরনের উগ্রবাদ রয়েছে যেগুলো সম্পর্কে আমরা ভাবতে চাই না কিংবা আমাদের দৃষ্টিগোচর হয় না। এখানে আমি সেই ধরনের কিছু উগ্রবাদের বিষয়ে তুলে ধরছি :

১. মতাদর্শগত অসহিষ্ণুতা এবং আধিপত্যের রাজনীতি

​যেকোনো মতবাদ বা আদর্শকে অন্যের ওপর জবরদস্তি করে বিজয়ী করার কট্টর মানসিকতাই উগ্রবাদের আঁতুড়ঘর। মানুষ মাত্রই তার চিন্তা, বিশ্বাস এবং জীবনবোধে স্বতন্ত্র হবে—এটাই প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু এই বৈচিত্র্যকে মেনে না নিয়ে নিজের মতবাদকে চরম সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জেদ থেকেই সমাজে উগ্রবাদের জন্ম হয়।

​যখন একটি নির্দিষ্ট মতাদর্শ অন্য সব মতকে স্তব্ধ করে দিতে চায়, তখন তা কেবল তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সংঘাতে রূপ নেয়। এই আধিপত্যকামী মানসিকতা সমাজ থেকে পারস্পরিক সহনশীলতা ও ইনসাফকে চিরতরে মুছে ফেলে।

​২. আধুনিকতার নামে সংস্কৃতি বিনাশী জঙ্গিবাদ

​সমাজে আধুনিকতা প্রতিষ্ঠার এক অদ্ভুত জেদ আজ জেঁকে বসেছে। এই তথাকথিত আধুনিকতার ছদ্মাবরণে পৃথিবীতে চলে আসা চিরাচরিত মানবসংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং অনুশাসনগুলোর প্রতি একধরনের তীব্র ঘৃণা পোষণ করা হয়। যারা এই চিরাচরিত জীবনবোধ ও মূল্যবোধকে লালন করে, তাদের ওপর নানা কায়দায় দমন-পীড়ন চালানো হয়।

​এই প্রবণতা প্রচলিত বা গতানুগতিক উগ্রবাদের চেয়েও অনেক বেশি ভয়ংকর। কারণ এটি মানুষের আত্মপরিচয় এবং মৌলিক শেকড়কে ধ্বংস করে দিতে চায়। একে একধরনের সংস্কৃতি-বিনাশী জঙ্গিবাদ বললেও অত্যুক্তি হয় না।

​৩. তথ্য সন্ত্রাস ও ‘নাস্তিক্য’ নামক উগ্রবাদ

​মতাদর্শিক লড়াইয়ের মাঠে বর্তমানে সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠেছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি। ধর্ম কিংবা চিরাচরিত কোনো সামাজিক বিশ্বাসের ভিত্তিকে দুর্বল করতে এবং একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে টার্গেট করে পরিকল্পিতভাবে তথ্য সন্ত্রাস ও অপতথ্য ছড়ানোর প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে।

​ধর্মকে দমিয়ে বা হেয় প্রতিপন্ন করে একপেশে অধর্ম বা নাস্তিক্যবাদী সংস্কৃতি জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার এই অপচেষ্টাও একপ্রকার উগ্র জঙ্গিবাদ। যখন বাকস্বাধীনতার নামে নির্দিষ্ট কোনো বিশ্বাসকে অবমূল্যায়ন করে ঘৃণা ছড়ানো হয়, তখন তা সমাজকে মেরুকরণের চরম পর্যায়ে নিয়ে যায়।

​৪. আইনগত ভারসাম্যহীনতা ও পারিবারিক কাঠামোর পতন

​মানবসভ্যতার আদিকাল থেকেই সমাজে অধিকার ও দায়িত্বের একধরনের ভারসাম্য ছিল। অতীতে সমাজের কিছু স্তরে নারীর প্রতি অবিচার বা অধিকার হরণের ইতিহাস থাকলেও, বর্তমান যুগে এসে তার বিপরীতে এক মাত্রাতিরিক্ত সহানুভূতিশীল অবস্থান নেওয়া হয়েছে। এর ফলে রাষ্ট্র কর্তৃক এমন কিছু আইন প্রণয়ন করা হচ্ছে যা অনেক ক্ষেত্রে ভারসাম্য হারিয়ে পুরুষের জীবনের জন্য অত্যন্ত প্রাণঘাতী ও অসহনীয় হয়ে উঠছে।

​এই উগ্র নারীবাদী চেতনা এবং একপেশে আইন কাঠামোর ফলে সমাজের ভিত্তিভূমি—অর্থাৎ সংসার ও পরিবারগুলো আজ মারাত্মকভাবে কলুষিত হচ্ছে। চিরাচরিত মানবিক বন্ধনগুলো ভেঙে পড়ছে এবং আইনের অপপ্রয়োগের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে কেবল পুরুষ সমাজ। আইনের চোখে সমতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার বদলে যখন একটি পক্ষকে পুরোপুরি কোণঠাসা করা হয়, তখন তা পারিবারিক শান্তি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার মূলে আঘাত হানে। একে উগ্রবাদের একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ছাড়া আর কী বলা চলে?

৫. চেতনার বিভাজন: রাষ্ট্রকে ভস্ম করার অনল

​জাতীয়তাবাদী চেতনা, মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কিংবা বামপন্থী ও ডানপন্থী রাজনৈতিক দর্শনের দোহাই দিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে কৃত্রিম বিভাজন সৃষ্টি করাও উগ্রবাদের একটি অত্যন্ত পরিচিত রূপ। একটি রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের অবদান এবং অধিকার সমান হওয়ার কথা থাকলেও, চেতনার লেবাস পরে যখন বিশেষ একটি গোষ্ঠীকে একপেশে সুবিধা দেওয়া হয় এবং অন্যপক্ষকে কোণঠাসা করা হয়, তখন তা সমাজে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করে। এই রাজনৈতিক ও আদর্শিক বিভাজন শুধু সমাজের সৌহার্দ্যই নষ্ট করে না, বরং পুরো একটি রাষ্ট্রকে অনাস্থা ও সংঘাতের আগুনে পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়।

​৬. অর্থনৈতিক উগ্রবাদ: সর্বগ্রাসী ও নীরব বৈষম্য

​সমাজের সব ধরনের উগ্রবাদের আলোচনার ভিড়ে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত থেকে যায়, তা হলো "অর্থনৈতিক উগ্রবাদ"। অথচ এটিই বর্তমান মানবসভ্যতার সবচেয়ে ভয়ংকর, নিষ্ঠুর এবং সর্বগ্রাসী রূপ।

​অতিরিক্ত আর্থিক লোভের বশবর্তী হয়ে অন্যের অধিকার কেড়ে নেওয়া, ইনসাফ ও ন্যায়ের বদলে জুলুমের অর্থনৈতিক ভিত্তি স্থাপন করা এবং মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে রাষ্ট্রের সিংহভাগ সম্পদ কুক্ষিগত করার প্রবণতাই হলো অর্থনৈতিক উগ্রবাদ।

​সিন্ডিকেট ও শোষণ: বাজার সিন্ডিকেট তৈরি করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের গ্রাস কেড়ে নেওয়া, সুদভিত্তিক ও শোষণমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মাধ্যমে মেহনতি মানুষের ঘাম ঝরানো শ্রমের সঠিক মূল্য না দেওয়া এবং সম্পদের পাহাড় গড়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতা আজ সমাজকে গ্রাস করেছে।

​মানবিক বিপর্যয়: এই অর্থনৈতিক উগ্রতার কারণে ধনী আরও ধনী এবং দরিদ্র আরও দরিদ্র হচ্ছে। মৌলিক মানবাধিকার, অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থানের অধিকার থেকে সাধারণ মানুষ বঞ্চিত হচ্ছে। এটি কেবল বৈষম্যই বাড়ায় না, বরং সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অপরাধ ও হতাশা ছড়িয়ে দেয়।

​সামগ্রিক রোগমুক্তি বনাম খণ্ডিত চিকিৎসা

​প্রকৃতিগতভাবেই মানুষের চেহারা, অবয়ব, চিন্তা-চেতনা এবং কর্মপদ্ধতিতে ভিন্নতা রয়েছে। এই বৈচিত্র্যই মানবসভ্যতার সৌন্দর্য। কিন্তু এই ভিন্নতাকে সহ্য করতে না পেরে অন্যের মতবাদকে ঘৃণা করা, নিজ মতের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা চালানো, ইনসাফ ও ন্যায়ের জায়গায় জুলুম প্রতিষ্ঠা করা এবং অতিরিক্ত লোভে মত্ত হয়ে মানুষের ওপর অন্যায় করা—এ সবই উগ্রবাদের বহুমুখী প্রকাশ।

​চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটি চিরন্তন সত্য হলো—রোগ যদি পুরো শরীরে (মাথা থেকে পা পর্যন্ত) বাসা বেঁধে থাকে, তবে শরীরের কেবল একটি নির্দিষ্ট অঙ্গের চিকিৎসা করে রোগ থেকে পুরোপুরি মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়। একইভাবে, আমাদের সমাজে উগ্রবাদের বহুমুখী রূপগুলোকে আড়াল করে কেবল একটি নির্দিষ্ট দিক বা ক্ষেত্র নিয়ে মাতামাতি করলে কাঙ্ক্ষিত শান্তি ও শৃঙ্খলা কোনো দিনই ফিরে আসবে না।

​রাজনৈতিক, সামাজিক, পারিবারিক এবং অর্থনৈতিক—সর্বস্তরের উগ্রবাদকে একযোগে চিহ্নিত করে সামগ্রিক সংস্কার ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই কেবল একটি সুস্থ, সুন্দর ও মানবিক পৃথিবী গড়ে তোলা সম্ভব।

লেখক : মো. আরাফাত রহমান, কলামিস্ট ও সাংবাদিক, সাবেক শিক্ষার্থী, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়

বিজ্ঞাপন বিজ্ঞাপন

আরো দেখুন


বিজ্ঞাপন

পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...